জীবনানন্দের নদী ও তার জীবনসত্তা

সুগন্ধা নদীতে ভোর, ঝালকাঠি

জীবনান্দকে যেসব কারণে প্রকৃতি ও রূপসী বাংলার কবি বলা হয়, তার অন্যতম প্রধান কারণ নদী। বাংলা সাহিত্য তো বটেই, বিশ্বসাহিত্যে এরকম নদীঅন্তঃপ্রাণ কবি বিরল।

জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি নদীর সঙ্গে থেকেছেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালকেই নদী আছে। মাঝবয়সে লেখা বাংলার অপরূপ রূপে আক্রান্ত ‘রূপসী বাংলা’য় তো বটেই। শেষদিকে লেখা কবিতায়ও আছে। যদিও শেষদিকের কবিতায় দুর্বোধ্যতার অভিযোগ ছিল। কিন্তু নদী তাঁকে ছেড়ে যায়নি।

‘নদী’ শিরোনামেই আমরা তাঁর কবিতা পাচ্ছি অন্তত চারটি। আর শিরোনামে ‘নদী’ শব্দটি আছে এরকম কবিতা আরও বেশ কিছু। যেমন নদী নক্ষত্র মানুষ, রক্ত নদীর তীরে, হেমন্তের নদীর পারে, অনেক নদীর জল। এছাড়া সরাসরি নদীর নামে কবিতাও পাওয়া যায়। যেমন প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালকে আছে সিন্ধু, সিন্ধুর ঢেউয়ের মতো এবং অদ্ভুত সিন্ধুর মতো শিরোনামে তিনটি কবিতা।

১. ‘নদী’ শিরোনামে যে কবিতাগুলো পাওয়া যায় তার মধ্যে ঐতিহ্য প্রকাশিত জীবনানন্দ রচনাবলির দ্বিতীয় খণ্ডে (পৃ. ৮৩) অন্যান্য কবিতা অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত কবিতাটি বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত জীবনানন্দের প্রথম কাব্য সংকলনে (জীবনানন্দ দাশের কাব্য সম্ভার, রণেশ দাশগুপ্ত সম্পাদিত, খান ব্রাদার্স ১৯৬৯) ‘নদীরা’ শিরোনামে ঠাঁই পেয়েছে। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় কবিতা পত্রিকার আশ্বিন ১৩৪৩ সংখ্যায়। ১৪ লাইনের এই কবিতায় জীবনানন্দ নদীকে প্রাণসর্বস্ব সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেন। শুরুটা এরকম:

‘বঁইচির ঝোপ শুধু শাঁইবাবলার ঝাড়—আম জাম হিজলের বন—

কোথাও অর্জুন গাছ—তাহার সমস্ত ছায়া এদের নিকটে টেনে নিয়ে

কোন কথা সারা দিন কহিতেছে অই নদী?—এ নদী কে? ইহার জীবন

হৃদয়ে চমক আনে।’

এখানে তিনি বলছেন, এ নদী কে? মানে নদী এখানে ব্যক্তি, মানুষ। আগের লাইনে বলছেন, ‘কোন কথা সারাদিন কহিতেছে অই নদী।’ তার মানে নদী কথা বলে। পরের লাইনে বলছেন: ‘ইহার জীবন হৃদয়ে চমক আনে।’ তার মানে নদীর জীবন আছে, যে জীবন মানুষের হৃদয়ে চমক আনে।

কবিতার শেষটা বেশ ট্র্যাজিক। লিখেছেন:

‘এক দিন এই নদী শব্দ ক’রে হৃদয়ে বিস্ময়

আনিতে পারে না আর; মানুষের মন থেকে নদীরা হারায়—শেষ হয়।’

অর্থাৎ মানুষের মন থেকে নদী হারিয়ে গেলে সেই নদীও শেষ হয়ে যায়। যারা নদী দখল করেন, কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলে নদী খুন করেন—জীবনানন্দ বলছেন, তাদের মনের ভেতরে নদী নেই।

২. ‘নদী’ শিরোনামে আরেকটি কবিতা আছে জীবনানন্দ রচনাবলির তৃতীয় খণ্ডে (পৃ. ১০১) অন্যান্য কবিতা অধ্যায়ে। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পত্রিকার শারদীয় ১৩৫৯ সংখ্যায়। ২৭ লাইনের এই কবিতায়ও মানুষের মনের প্রসঙ্গ আছে। মনকে তিনি তুলনা করেছেন নদীর সঙ্গে।

‘মনে হয় যেন মানুষের মন তবু

দুই কালো বালুতীর ভেদ করে ফেলে

চলেছে নদীর মতো।’

বুড়িগঙ্গা নদী, ঢাকা

৩. ধূসর পাণ্ডুলিপি পর্যায়ে লেখা ‘নদী’ শিরোনামে আরেকটি কবিতা পাওয়া যায়, যেটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে রচনাবলির চতুর্থ খণ্ডে (পৃ. ৮৬) অন্যান্য কবিতা অধ্যায়ে। ‘নদী’ শিরোনামে কবিতাগুলোর মধ্যে এটি বহুল পঠিত। বিশেষ করে আবৃত্তিশিল্পীদের খুব পছন্দের একটি কবিতা।

‘রাইসর্ষের ক্ষেত সকালে উজ্জ্বল হল-দুপুরে বিবর্ণ হয়ে গেল

তারই পাশে নদী;

নদী, তুমি কোন্ কথা কও?’

এখানেও নদীর কথা বলার প্রসঙ্গ। অর্থাৎ নদীর যে প্রাণ আছে বা কথা বলার শক্তি আছে, সেই কথা জীবনানন্দ আমাদের জানিয়েছেন প্রায় এক শতাব্দী আগে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত ২০০৯ সালে একটি রায়ে বলেছেন, নদী হচ্ছে লিভিং এনটিটি বা জীবন্ত সত্তা। অতএব মানুষের মতো তারও বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

নদীকে আর প্রাণময়, আরও বেশি আপন করতে এই কবিতায় তিনি নদীকে নিজের মেয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন:

‘তুমি যেন ছোটো মেয়ে-আমার সে ছোটো মেয়ে;

যত দূর যাই আমি-হামাগুড়ি দিয়ে তুমি পিছে পিছে আস,

তোমার ঢেউয়ের শব্দ শুনি আমি: আমারই নিজের শিশু সারা দিন নিজ মনে কথা কয়।’

৪. অনেকটা গানের সুরে লেখা ‘নদী’ শিরোনামে আরেকটি কবিতা স্থান পেয়েছে রচনাবলির পঞ্চম খণ্ডে (পৃ. ১১৩) অন্যান্য কবিতা অধ্যায়ে। চারটি স্তবকে লেখা ১৬ লাইনের এই কবিতাটি প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকার নভেম্বর ১৯৯৮ সংখ্যায়। অর্থাৎ জীবনানন্দ জন্মশতবর্ষের আগের বছর। কবিতার ভাষা ও লেখার ঢংয়ে মনে হয় এটি তাঁর প্রথম দিককার, অর্থাৎ ঝরাপালক পর্যায়ের কবিতা।

‘ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনী ঐ যাইছে বহিয়া।

কত শত জীবজন্তু বক্ষেতে ধরিয়া।

স্রোতস্বিনী বহে ঐ কল কল রবে।

উতরিয়া কত দেশ সমুদ্রেতে যাবে।’

নদী নক্ষত্র মানুষ

শিরোনামে ‘নদী’ শব্দটি রয়েছে এরকম যে কয়টি কবিতা পাওয়া যায়, তার মধ্যে ‘নদী নক্ষত্র মানুষ’ প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকার ২ আশ্বিন ১৩৬০ সংখ্যায়। জীবনানন্দ যে নদীর নামকরণ করতেন বা ভালোবেসে নদীর নাম দিতেন, সেটি জানা যাচ্ছে এই কবিতায়।

‘এখানে জলের পাশে বসবে কি? জলঝিরি এ নদীর নাম;

অপরূপ; আমি তবু ঝাউবনী বলি একে’—আস্তে বললাম।’

জলসিড়ি/কীর্তনখোলা নদী, বরিশাল

প্রসঙ্গত, জলসিড়ি নামে কোনো নদীর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। কিন্তু জীবনানন্দের একাধিক কবিতায় জলসিড়ির প্রসঙ্গ আছে। গবেষকরা দেখিয়েছেন, জলসিড়ি আসলে জীবনানন্দের জন্মস্থান বরিশাল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলা নদী। জীবনানন্দ ভালোবেসে এই নদীর নাম লিখেছেন জলসিড়ি। বরিশাল শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে ঝালকাঠি শহরের পশ্চিম প্রান্তে বয়ে গেছে জীবনানন্দের আরেক ভালোবাসার নদী ধানসিড়ি। ধানসিড়ির সঙ্গে মিল রেখে তিনি হয়তো জলসিড়ি লিখেছেন।

ধানসিড়ি নদী, ঝালকাঠি

এই কবিতায়ও মনের প্রসঙ্গ আছে। ‘সে বললে-শেষ সত্য নদী নয়, মন।’ অর্থাৎ মানুষের মনকে তিনি নদীর সঙ্গে তুলনা করলেও শেষ সত্য যে মন, সেটি তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। কেননা মানুষের মন থেকে নদীরা হারালে নদী শেষ হয়ে যায়। অতএব নদীর সুরক্ষায় তিনি মানুষের মনের ওপরেই জোর দিয়েছন। কবিতাটি শেষ হয়েছে এভাবে: ‘নদী ও এই নারী নিজ বাস্তবতা নিয়ে তন্ময়।’ এখানে নদীকে তিনি নারীর সমার্থক করেছেন। নদীও যে নারীর মতো—সে কথা আরও অনেকেই লিখেছেন। অর্থাৎ এখানেও সেই জীবন্ত সত্তা।

হেমন্তের নদীর পারে

শিরোনামে নদী আছে, এরকম আরেকটি কবিতা ‘হেমন্তের নদীর পারে’। প্রবন্ধ-পত্রিকার মাঘ ১৩৬৮ সংখ্যায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

‘মাঝে মাঝে মনে হয়

হেমন্তসন্ধ্যায় এই বৃক্ষদের মুখ দেখে

আবছায়া নদীর দর্পণে:

যে বিতর্ক লোপ পায় বালিকার মেধে

অথবা যুবার চিত্তে অকালজটীর মতো আশ্চর্য নির্বেদে

কিংবা যোদ্ধৃদের প্রাণে সারা দিন বায়ুকুকুরের মতো ঘুরে—

তবু মানুষের সাথে শুক্ল পরিচয় চেয়ে নিশীথের ভূমিকায়

সেই সব চিন্তা এসে পিতাদের হৃদয়ে দাঁড়ায়।’

অনেক নদীর জল

চতুরঙ্গ পত্রিকার শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩৫৯ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় অনেক নদীর জল।

‘অনেক নদীর জল উবে গেছে-

ঘর বাড়ি সাঁকো ভেঙে গেল;

সে-সব সময় ভেদ ক’রে ফেলে আজ

কারা তবু কাছে চলে এল।’

নদীর ভাঙনের কথা জীবনানন্দের আরও অনেক কবিতায় আছে। মুন্সিগঞ্জের (বিক্রমপুর) গাউপাড়া গ্রামে তাঁর পূর্বপুরুষের জন্মভিটাও বিলীন হয়েছে পদ্মার ভাঙনে। সেই ভাঙনের গল্প তিনি শুনেছেন ঠাকুমার কাছে। পরবর্তীকালে লিখেছেন:

‘তবু তাহা ভুল জানি-রাজবল্লভের কীর্তি ভাঙে কীর্তিনাশা;

তবুও পদ্মার রূপ একুশরত্নের চেয়ে আরো ঢের গাঢ়

আরো ঢের প্রাণ তার, বেগ তার, আরো ঢের জল, জল আরো।’

পদ্মা নদী, মুন্সীগঞ্জ; এখানে দাঁড়িয়ে দূরে যে জাহাজটি দেখা যাচ্ছে, সেখানেই ছিল জীবনানন্দের পূর্বপুরুষের গাউপাড়া গ্রাম

নদীর জীবনসত্তা

নদীর যে প্রাণ আছে বা নদী যে একটি জীবন্ত সত্তা, অতএব তারও মানুষের মতো বেঁচে থাকার আইনি অধিকার নিয়ে এখন কথা যে হচ্ছে, এই উপলব্ধিটা জীবনানন্দের মনে এসেছে আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে। হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠনের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ হাইকোর্ট নদী রক্ষায় যে ঐতিহাসিক রায়টি দেন, সেখানে বলা হয়েছে দেশের নদীগুলো এখন থেকে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর মতোই আইনি অধিকার পাবে। আদালতের রায় অনুযায়ী নদীগুলো এখন ‘জুরিসটিক পারসন’ বা ‘লিগ্যাল পারসন’। এর মধ্য দিয়ে মানুষের মতো নদীরও মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।

নদীর যে প্রাণ আছে তার সহজ যুক্তি হলো নদীকে ঘিরে পৃথিবীর সমস্ত সভ্যতা গড়ে উঠেছে। সকল প্রাণ এসে মিশেছে নদীর তীরে। নদী আছে বলেই তার জলসিঞ্চিত হয়ে ফসলের মাঠ সবুজে ভরে ওঠে। সেই ফসলের ক্ষেতে উড়ে আসে পাখি, পতঙ্গ। অর্থাৎ শুধু মানুষ নয়, সকল প্রাণীর মিলনস্থলও এই নদী। নদী না থাকলে প্রাণ ও সভ্যতার বিকাশ অসম্ভব।

‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থের ‘ক্ষেতে প্রান্তরে’ কবিতায় নদী একটি শরীরসর্বস্ব সত্তা:

‘জলপিপি চলে গেলে বিকেলের নদী

কান পেতে নিজের জলের সুর শোনে।’

তার মানে নদীর কান আছে। সে নিজের সুর শোনে। মানে সে সুর তোলে। তার কণ্ঠ আছে।

নদীকে জীবনানন্দ প্রিয় মানুষের মতোই ভালোবেসেছেন। তাঁদের সুখে-দুঃখে কাতর হয়েছেন। ফলে মৃত্যুর পরে এই নদী তাকে ফের ডাকবে কি না সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন প্রথম দিককার কবিতা ‘ঝরা ফসলের গান’-এ:

‘ওগো নদী, ওগো পাখি,

আমি চলে গেলে আমারে আবার ফিরিয়া ডাকিবে নাকি!

আমারে হারায়ে তোমাদের বুকে ব্যথা যদি জাগে ভাই,

জেনো আমি দুখ জাগানিয়া—বেদনা জাগাতে চাই!’

নদীকে এখানে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করছেন। তাঁর চলে যাওয়ার পর নদীর বুকে ব্যথা জাগবে কি না সেই হাহাকারও এখানে স্পষ্ট।

‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ কাব্যগ্রন্থের ‘পেঁচা’ কবিতার প্রথম স্তবক:

‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে

হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে

শুধু শিশিরের জল

অঘ্রাণের নদীটির শ্বাসে

হিম হয়ে আসে

বাঁশপাতা—মরা ঘাস—আকাশের তারা’।

অঘ্রান মাসে নদীর শ্বাসে মানে নিঃশ্বাসে বাঁশপাতা হিম বা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। অর্থাৎ নদী নিঃশ্বাস নেয়। মানে নদীর প্রাণ আছে।

সভ্যতার গড়ে ওঠা ও বিস্তারে নদী যে মানুষের সহায়ক এবং সে যে নিছক প্রবহমান ধারাই নয়, সে কথা বলছেন ‘জনান্তিকে’ কবিতায়:

‘তবুও নবীন নুড়ি—নতুন উজ্জ্বল জল নিয়ে আসে নদী।’

নদীর জলে মানুষ তার মুখ দেখে। মুখ দেখে মানে সে তাকে চেনে নদীর আয়নায়। ‘আমরা’ কবিতার দুটি লাইন:

‘যদিও নদীর জলে,

যত দিন কেটে যায়,

দেখি -আরো বেশি

আমাদের মুখ আরো বেশি ম্লান হয়।’

আড়িয়াল আড়িয়াল খাঁ নদীতে গোধূলি

অর্থাৎ সময়ের সাথে সাথে ব্যক্তির মুখই যে শুধু ম্লান হয় তাই নয়, সে নদীর প্রতি কী আচরণ করলো সে কথাও নদী তাকে বলে দেয়। নদীর স্বচ্ছ জলে মানুষ তার পরিষ্কার চেহারাই দেখে। কিন্তু বুড়িগঙ্গা-তুরাগের নোংরা জলে মানুষ তার ম্লান ও ধূসর রূপ ছাড়া কিছু দেখে না। নদী এখানে মানুষের অবিবেচক মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলে। নদী এখানে কেবলই প্রবহমান নিষ্প্রাণ ধারা নয়।

মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থের ‘পরিচায়ক’ কবিতায় বিকলাঙ্গ নদীর কথাও বলছেন:

‘এইদিকে বিকলাঙ্গ নদীটির থেকে পাঁচ-সাত ধনু দূরে মানুষ এখনও নীল, আদিম সাপুড়ে।’

অর্থাৎ মানুষ যে তার শিল্প আর নগরায়ণের জন্য নদীকেই বিকলাঙ্গ করে তোলে, এখানে সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

‘স্ট্যান্ডে’ শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন:

‘নদী এখানে ট্রামের লাইনের মতো যেন

কিম্বা টেলিগ্রাফের তারের মতো

টেলিফোনের তারের মতো

নদীকে এখানে কে কবে দেখেছে?’

দেশের বিপন্ন নদীগুলোর দিকে তাকালে মনে হবে তিনি বোধ হয় কবিতাটি সম্প্রতি লিখেছেন।

ধূসর পান্ডুলিপির ‘অনেক আকাশ’ শিরোনামের কবিতার কয়েকটা লাইন:

‘যেইখানে পৃথিবীর মানুষের মতো ক্ষুব্ধ হয়ে

কথা কয়, আকাঙ্ক্ষা আলোড়নে চলিতেছে বয়ে

হেমন্তের নদী, ঢেউ ক্ষুধিতের মতো এক সুরে

হতাশ প্রাণের মতো অন্ধকারে ফেলিছে নিঃশ্বাস।’

অর্থাৎ হেমন্তের নদী মানুষের মতো ক্ষুব্ধ হয়, কথা কয়। মানুষের মতো তাঁরও জীবনে হতাশা আসে। তারপর অন্ধকারে সে নিঃশ্বাস ফেলে। রূপসী বাংলার কয়েকটা লাইন:

‘বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে

কৃষ্ণা দ্বাদশীর জোছনা যখন মরিয়া গেছে নদী চড়ায়

সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল হায়,

শ্যামার নরম গান শুনেছিল একদিন অমরায় গিয়ে

ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়

বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।’

বেহুলার পায়ের কাছে বাংলার নদী কেঁদেছিল। এখানে নদী অনুভূতিপ্রবণ। সে ঘুঙুরের মতো কেঁদেছিল মানে ঘুঙুরের যে ঝংকার, রিনিঝিনি, নদীর চ্ছলাৎ চ্ছলের সাথে তার মিল। মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থের ‘উদায়স্ত’ কবিতায়ও নদীর অনুভূতির তর্জমা: ‘সূর্যের উদয় সহসা সমস্ত নদী চমকি করে ফেলে’। নদী চমকিত হয়। অর্থাৎ নদীর অনুভূতি আছে।

মহাপৃথিবীর ‘আবহমান’ কবিতায় বলছেন: ‘নেউলধূসর নদী আপনার কাজ বুঝে প্রবাহিত হয়।’

নিজের কাজ বুঝে কে চলে? যার বোধ আছে। এখানে নদী বোধসম্পন্ন প্রাণী। তবে সেই নদীর উপর মানুষের অধিকার অনেক সময়ই অনধিকার চর্চা হতে হতে নদী মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত বিবিধ কর্মকাণ্ডে বিপন্ন হলে সেও মানুষের ভালোবাসা চায়।

রূপসী বাংলার একটি কবিতার অংশ:

‘আমাদের কালিদহ—গাঙুড়—গাঙের চিল তবু ভালোবাসা

চায় যে তোমার কাছে—চায়, তুমি ঢেলে দাও নিজেরে নিঃশেষে।’

অর্থাৎ কালিদহ ও গাঙুড় নদী মানুষের ভালোবাসা চায়। বস্তুত পৃথিবীর সব নদীই মানুষের ভালোবাসা চায়।

এই অংশেরই আরেকটি লাইন: ‘দেখিয়াছি নদীটিরে—মজিয়াছে ঢালু অন্ধকারে’। মজিয়াছে মানে তারও অনুভূতি আছে; আনন্দ প্রকাশের অবকাশ আছে।

নদী শুধু মানুষের মতো নয়; মানুষের হৃদয়কেও তিনি নদীর সাথে তুলনা করেছেন। মহাপৃথিবীর ‘হে হৃদয়’ কবিতার শুরুটা এরকম: ‘হে হৃদয়, একদিন ছিলে তুমি নদী;

পারাপারহীন এক মোহনায় তরণীর ভিজে কাঠ

খুঁজিতেছে অন্ধকার স্তব্ধ মহোদধি’।

‘সে’ কবিতায় নদীর জলকে প্রেমিকার চোখের সঙ্গে তুলনা করে লিখেছেন:

‘সে আমাকে নিয়েছিল ডেকে; বলেছিল; এ নদীর জল তোমার চোখের মতোই ম্লান বেতফল।’

মৃত্যুর পরে তিনি যেমন শঙ্খচিল-শালিক বা কমলালেবু হয়ে ফিরতে চেয়েছেন, তেমনি মানুষ যদি মানুষ না হয়ে নদী হতো, সেই আকা কথাও আছে এই কবিতার শেষ দুই লাইনে:

‘ভালোবেসে ষোলো আনা নাগরিক যদি

না হয়ে বরং হতো ধানসিড়ি নদী।’

জীবনানন্দের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সবচেয়ে বেশি পঠিত কবিতা বনলতা সেনের শেষ দুটি লাইন:

‘সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী

ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

অর্থাৎ পাখিদের মতো নদীও ঘরে ফেরে। পাখির যেমন ঘরে ফেরার তাড়া, তেমনি নদীরও। এখানে পাখির মতো নদীও প্রাণী হয়ে ওঠে। তারও জীবনের, বেঁচে থাকার তাড়না এখানে স্পষ্ট। এখানেও নদী জীবন্ত সত্তা।

বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থে ‘শিরিষের ডালপালা’ শিরোনামের একটি কবিতার দুটি লাইন:

‘বিকেল বলেছে এই নদীটিকে: ‘শান্ত হতে হবে’।

অর্থাৎ নদীর সাথে বিকেলের কথা হয়। এখানে বিকেল বস্তুত সময়। সময় কথা বলে নদীর সাথে। এখানে সময়েরও প্রাণ আছে। কথা বলা মানে সেখানে বাক্যশব্দসেমিকোলন থাকে। জীবনানন্দের কবিতার এটিই শক্তি যে, সেখানে জড়বস্তুতেও প্রাণ সঞ্চারিত হয়। নদী কখন মানুষে পরিণত হয়, পাঠক তা টেরই পায় না।

জীবনানন্দের সব কাব্যগ্রন্থেই কমবেশি নদীর কথা আছে। নদীর নাম আছে। তবে তাঁকে প্রকৃতি ও রূপসী বাংলার কবি বলা হয় যে রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থেও জন্য, সেখানে ৭৩টি কবিতার মধ্যে তিনি আলাদা করে ১৫টি নদীর নাম মোট ৩৯ বার উল্লেখ করেছেন। আর শুধু ‘নদী’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন ২৩ বার। উল্লিখিত নদীগুলো হচ্ছে গাঙুড়, ধানসিড়ি, জলসিড়ি, কালীদহ, ধলেশ্বরী, চিলাই, জলাঙ্গী, কীর্তিনাশা, কৃষ্ণা, যমুনা, পদ্মা, কর্ণফুলী, মেঘনা, ইছামতী, ময়জানি। এর মধ্যে গাঙুড়, কালীদহ, ময়জানি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না।

কেন নদীর কাছেই ফিরতে চান?

তুরাগ নদী, ঢাকা

জীবনানন্দ বারবার ফিরে আসতে চেয়েছেন নদীর কাছে। এমনকি মৃত্যুর পরেও ভোরের কাক হয়ে, শঙ্খচিল শালিকের বেশে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে। পউষের রাত্রিতে শুয়ে থেকেছেন নদীর কিনারে। নদীর জলে খুঁজেছেন নিজের প্রতিকৃতি। নদী তাঁর কাছে সৌন্দর্যের বারতা নিয়ে আসে। তাই বারবার নদীর গোলাপি ঢেউয়ের কাছে ফিরে আসেন। নদী তাঁর কাছে এক অপার রহস্য বটে। নদীর জলে তিনি শুনতে পান প্রেম ও নক্ষত্রের গান। তিনি গোধূলি নদীর মৌন জলে রূপসীর মতো প্রিয়ার মুখখানা দেখে ধীরে, ধীরে আরো ধীরে শান্তি ঝরতে দেখেন, আকাশ হতে স্বপ্ন ঝরতে দেখেন। তাঁর করুণ চোখও মাঝে মধ্যে পথ ভুলে ভেসে যায় ময়জানি নদীর পাশে। যখন হৃদয়ে তাঁর তাতার বালির মতো তৃষা জেগে ওঠে, তখন নদীর আঁধার জলে ভরে যায় তাঁর বুক। তিনি দেখেন গ্রামবালিকা স্নান সেরে তার শাড়ি যখন দুপুরের রোদে নদীর তীরে শুকোতে দেয়, তখন তা যেন হলুদ পাতার মতন সরে যায়।

জীবনের নিত্যদিনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর সঙ্গে নদীর যে সম্পর্ক, জীবনানন্দ সেটি উপলব্ধি নিজের জীবন দিয়ে। তিনি যখন মৃত্যুর ঘুমে শুয়ে রবেন, তখনও এই নদীর পাশে নিজেকে কল্পনা করেন। যেন এই নদী মৃত্যুর পরেও তাঁকে আপন মমতায় বেঁধে রাখে। আকাশের থেকে দূরে আরো দূর নির্জন আকাশে যখন তিনি অকারণ ঘুমে ঢুলে পড়ে যান, তখন তিনি এই নদীর পাশেই জেগে ওঠেন। দেখেন তাঁর শ্মশানচিতা বাংলার ঘাসে ভরে আছে। বাসকের গন্ধ পান। দেখতে পান আনারস ফুলে ভোমরা উড়ছে। গুবরে পোকার ক্ষীণ গুমরানি বাতাসে ভাসছে। এরা তাঁকেই ভালবাসে। এদের ভালবাসার টানেই তিনি ফিরে আসেন বারবার।

দূষণে বিপর্যস্ত গাজীপুরের লবণদহ নদী

নদীকে তিনি প্রিয় মানুষের মতো ভালোবাসতেন বলেই নদীর সঙ্কোচন ও মৃত্যু তাঁকে পিড়ীত করেছে। বাংলাদেশের বড় শহর ও শিল্পাঞ্চলের নদীগুলো উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির নামে যেভাবে বিপন্ন হয়েছে, নিহত হয়েছে কিংবা এখন মুমূর্ষু—জীবনানন্দের সময়ে পরিস্থিতি এত খারাপ ছিল না। এই সময়ের বাংলাদেশে তিনি বেঁচে থাকলে বিপন্ন নদীর শোকে আরও বেশি কাতর হতেন। কেননা তিনি নদীর জীবনসত্তায় যেমন বিশ্বাস করতেন, তেমনি জানতেন নদী আসলে মানুষের হৃদয়ে বসবাস করে। যার হৃদয়ে নদী নেই, তার পক্ষে নদীর জীবনসত্তা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top