রাষ্ট্রীয় পদক ও পুরস্কার নিয়ে প্রতি বছরই যে ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়, তাতে জনমনে এখন এই প্রশ্ন জাগছে যে, তাহলে কি রাষ্ট্রীয় পদক ও পুরস্কার বন্ধ করে দেয়া উচিত? সেটি অবশ্য মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো হয়ে যায়। তাহলে উপায় কী? উপায় হলো, মাথা রেখে তার ব্যথার চিকিৎসা করা। কিন্তু সেই চিকিৎসার মতো উপযুক্ত ডাক্তার আছে কি না?
অতীতে বিভিন্ন সময়ে দলীয় সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় পদক ও পুরস্কার নিয়ে যে বিতর্ক হয়েছে, এবার নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সেটি পিছু ছাড়লো না। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের জন্য যথারীতি এবারও ১০ জন লেখকের নাম ঘোষণা করা হলো। কিন্তু তারপরই এই তালিকা নিয়ে শোরগোল তৈরি হলো সোশ্যাল মিডিয়ায়। কোন লেখক কোন মতাদর্শের; জুলাই অভ্যুত্থানের তার কী ভূমিকা ছিল; তিনি আগের সরকারের আমলের সুবিধাভোগী কি না; যদি হন তাহলে তিনি স্বৈরাচারের দোসর; কো লেখকের ভাই কোন পত্রিকার সম্পাদক এবং তিনি সেই কারণে বিবেচিত হলেন কি না; অমুকের নাম ঘোষণা হলো তো তমুক কেন বাদ পড়লো ইত্যাদি।
অতীতে দেখা গেছে সোশ্যাল মিডিয়ার এইসব বিতর্কের মুখে সরকার রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের জন্য নাম ঘোষণার পরেও কারো কারো নাম শেষমেষ বাতিল করেছে। শুধু তাই নয়, তিনি কোন প্রক্রিয়ায় বা কোন লবিংয়ে তালিকায় যুক্ত হলেন তা নিয়ে তদন্তও হয়েছে। এবারও তাই। সোশ্যাল মিডিয়ার চাপে এবার বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ পুরো তালিকাটিই স্থগিত করলো। গত ২৫ জানুয়ারি সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সারয়ার ফারুকী নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে জানিয়েছেন, সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবং পুরস্কার-তালিকাভুক্ত কারও কারো কারো সম্পর্কে কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় পূর্বঘোষিত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪-এর পুনর্বিবেচনা এবং উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফারুকী লিখেছেন, ‘যে আজব নীতিমালা এই ধরনের উদ্ভট এবং কোটারি পুরস্কারের সুযোগ করে দেয় সেগুলা দ্রুত রিভিউ করা উচিত।’
কথা হচ্ছে, বাংলা একাডেমি নিশ্চয়ই একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নামগুলো নির্ধারণ করেছিল। এর জন্য একটি কমিটিও আছে। সেখানে নামগুলো যাচাই-বাছাই হয়েছে। নিশ্চয়ই কমিটির লোকদের মধ্যে নামগুলো নিয়ে কিছু বাহাসও হয়েছে। সুতরাং এই তালিকায় একাডেমি কেন স্থির থাকতে পারলো না? সোশ্যাল মিডিয়ার চাপের কাছে সে নতি স্বীকার করলো কেন? লেখকদের নাম ঘোষণা করে সেটি যে স্থগিত করা হলো, এর মধ্য দিয়ে ওই লেখকদের কি অসম্মানিত করা হলো না?
ধরা যাক তালিকাটি নতুন করে হবে। সেখানে আগের তালিকা থেকে যদি কেউ বাদ পড়েন (নিশ্চয়ই পড়বেন), তাহলে তার যে সামাজিকভাবে সুনাম ক্ষুণ্ন হবে এবং তিনি যে তার পরিবারের কাছেও হেয়প্রতিপন্ন হবেন—তার দায় কে নেবে? এটি যদি ওই লেখকের মনোজগতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তার দায় কি বাংলা একাডেমি নেবে?
যদি সত্যিই এক বা একাধিক কিংবা ঘোষিত তালিকার সকলকে বাদ দিয়ে নতুন লেখকদের নাম ঘোষণা করা হয়, তাহলে বাংলা একাডেমি এর কী ব্যাখ্যা দেবে? কী কারণে তাদের নাম বাদ দেয়া হলো সেটি কি তারা দেশবাসীকে জানাবে? আর যদি কারো নাম বহাল থাকে তাহলে তাকে কেন বহাল রাখা হলো, তারই বা কী ব্যাখ্যা দেবে? সেই ব্যাখ্যা দি পছন্দ না হয় এবং পুনরায় এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা ও বিতর্কের ঝড় ওঠে, তখন বাংলা একাডেমি কি সেই তালিকাও স্থগিত করবে?
সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো, কোনো কোনো লেখক সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে যে জুলাই অভ্যুত্থানে তার কী ভূমিকা ছিল? এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মূলত জুলাই আন্দোলনে তার ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, জুলাই অভ্যুত্থানে কোনো ভূমিকা না থাকলে তাকে বাংলা একাডেমিক পুরস্কার দেয়া যাবে না? সকল লেখক কি জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় কিংবা তার লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন? এটি কি বাস্তবসম্মত?
এ বছর পুরস্কারপ্রাপ্ত কয়েকজন (জি এইচ হাবিব, মাসুদ খান, সলিমুল্লাহ খান ও সৈয়দ জামিল আহমেদ)
একজন কবি, কথাসাহিত্যিক বা গবেষককে পুরস্কার দেয়া হয় তার কাজের জন্য। তার লেখালেখি ও গবেষণার জন্য। এখানে তিনি কোন রাজনৈতিক মত ও আদর্শের লোক, তিনি জুলাই মাসে ফেসবুকে কী লিখেছিলেন অথবা লেখেননি; জুলাই অভ্যুত্থানকে তিনি মহিমান্বিত করেছিলেন নাকি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে লিখেছেন—এটি তো কোনো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা বা মানদণ্ড হতে পারে না। তাকে যে কারণে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে, সেই ক্ষেত্রে তার কী অবদান, তার লেখালেখি বাংলা সাহিত্যের বিকাশে কী ভূমিকা রেখেছে; জাতির মেধা ও মনন গঠনে তার কোনো অবদান রয়েছে কি না—এর বাইরে কোনো ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক অথবা মতাদর্শিক বিবেচনা থাকার কোনো কারণ নেই।
তিনি যদি রাষ্ট্রের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয় হন, সেটিও পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে তার অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। কেননা তিনি যদি সত্যিই লেখক বা গবেষক হিসেবে অনন্য কিছু করেন, তাহলে তিনি পুরস্কার পাবেন। তাতে তিনি যার ভাই হন কিংবা স্বামী অথবা স্ত্রী। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পরিচয় এখানে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ নেই।
বাস্তবতা হলো, বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় পদক ও পুরস্কারে লেখকের লেখা, গবেষণা ও অবদানের বাইরে এইসব বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। এখন যেমন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে যে জুলাই অভ্যুত্থানে অমুকের কী ভূমিকা ছিল, আগের সরকারের আমলেও একইভাবে প্রশ্ন তোলা হতো যে, তিনি রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক কি না; তার দলীয় আনুগত্য কতটুকু; তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি কি না ইত্যাদি। এর বাইরে প্রভাবশালী আমলাদের তদবির, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ইন্ধন এমনকি দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিও সেখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। এসবের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় পদক ও পুরস্কারগুলো বারবারই বিতকির্ত হয়েছে। কিছু প্রকৃত লেখক ও গবেষককে পুরস্কৃত করে প্রতি বছরই এমন কিছু নাম সেখানে যুক্ত করা হয়েছে, যাদের কাজ নিয়ে মানুষের মনে নানাবিধ সন্দেহ ও প্রশ্ন ছিল।
রাষ্ট্রীয় পদক ও পুরস্কারের জন্য নাম নির্বাচনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, যে বছর দশজন লেখকের নাম ঘোষণা করা হয়, সে বছরই হয়তো আরও পঞ্চাশজন লেখক ওই পুরস্কারের যোগ্য। যে কবিকে নির্বাচন করা হলো, হয়তো তার চেয়ে আরও অনেক ভালো কবিতা লিখেছেন, পাঠকমহলে তার চেয়ে অনেক বেশি সমাদৃত এবং সাহিত্যে তার অবদান পুরস্কৃত ব্যক্তির চেয়ে বেশি—এরকম লেখকের সংখ্যাও অনেক। সুতরাং কাকে কোন বিবেচনায় বা কোন যোগ্যতায় নির্বাচন করা হলো, সেটি বরাবরই একটি বড় প্রশ্ন। অনেকে সামান্য কিছু লিখেই বা সাহিত্যের বড় কোনো অবদান না রেখেই রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়ে গেছেন। আবার অনেকে অনেক বেশি লিখেও বা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেও তালিকায় আসেন না। তারা কী কারণে তালিকার বাইরে থেকে যান, সেটি কমবেশি দেশের মানুষ জানে। এসব কারণ অনেক সময় মনে করা হয়, যদি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও পদকের পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, পেশাদার, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ রাখা না যায়, তাহলে এইসব পুরস্কার বন্ধ করে দেয়া উচিত। তাতে কিছু টাকারও সাশ্রয় হবে। তাতে পুরস্কার দিতে গিয়ে সরকারও বিব্রত হবে না। উপরন্তু কারো নাম ঘোষণা করে সেটি স্থগিত করার মধ্য দিয়ে তাকে বেইজ্জত করা হবে না।
এটি একটি সহজ সমাধান। কিন্তু যেকোনো লেখক ও গবেষকের জন্যই রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একটি বড় স্বীকৃতি। পুরস্কার শুধু পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকের জন্যই নয়, বরং অন্য লেখকদের জন্যও এটি একধরনের অনুপ্রেরণা। কিন্তু সেই পুরস্কারের প্রক্রিয়াটি যদি স্বচ্ছ না হয়, যদি লেখক নির্বাচনের ক্ষেত্রে দল-মত-প্রতিষ্ঠান মূল বিবেচনায় থাকে; যদি বছরের পর বছর ধরে এখানে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে—তাহলে সেই পুরস্কার আখেরে লেখককে সম্মানিত করে না। সরকারকেও স্বস্তি দেয় না। ফলে রাষ্ট্রীয় পদক ও পুরস্কারের পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, দলনিরপেক্ষ, চাপমুক্ত, পেশাদার এবং সর্বোপরী দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত রাখতে একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।