শঙ্খের জলধারা

পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা শঙ্খ

অক্টোবরের ২০ তারিখ। বাংলা ক্যালেন্ডারে হেমন্তের প্রথম দশক। কার্তিকের চার। দুপুরের দিকে বান্দরবানের থানচি উপজেলা শহরে নেমে থানা ও বিজিবির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে যখন রেমাক্রির উদ্দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ওঠার প্রস্তুতি, তখনই বৃষ্টি। খোলা নৌকায় বৃষ্টিতে ভিজে এতটা পথ যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং ঘুরতে এসে জ্বর বাঁধালে সেটি এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আরেক বিপত্তি। কেননা এখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পাথুরে নদীতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে ভয়ঙ্কর সুন্দর পাহাড়ি পথে চান্দের গাড়িতে (পাহাড়ে চলাচল ‍উপযোগী জিপ টাইপের বিশেষ গাড়ি) আরও চার ঘণ্টা যাওয়ার পরে বান্দরবান সদর। সড়ক পথে ঢাকায় যেতে হলে আরও দশ ঘণ্টা। তার মানে রেমাক্রি থেকে একজন অসুস্থ মানুষকে ঢাকায় নিয়ে যেতে চাইলে ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টার ব্যাপার। তাও যদি পথে কোনো জটিলতা না হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, থানচি থেকে বিকাল ৩টার মধ্যে রওনা না দিলে সন্ধ্যার আগে রেমাক্রি পৌঁছানো যাবে না। অন্ধকার হয়ে গেলে খরস্রোতা এই পাথুরে নদীর জলে ইঞ্জিনচালিত নৌকার এই যাত্রা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই রেমাক্রির উদ্দেশে আমাদের যাত্রা শুরু। অবশ্য মিনিট বিশেক পরে বৃষ্টি থেমে যায়।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায় সৃষ্ট অনিন্দ্যসুন্দর এই নদীর নাম শঙ্খ। কাগজপত্রে এমনকি সরকারি তথ্য বাতায়নেও এর নাম সাঙ্গু। শঙ্খের মতো একটি সুন্দর নাম যে সাঙ্গু হয়ে গেলো, তার একটা ইতিহাস আছে।

এই অঞ্চলের মারমা জনগোষ্ঠীর লোকেরা নদীটিকে বলে ‘রিক্রইং খ্যিয়ং’ বা স্বচ্ছ নদী। আদিকাল থেকে তারা নদীটিকে এই নামেই চেনে। তবে ব্রিটিশ আমলে বাঙালি আমলারা গেজেটিয়ার করার সময় এটিকে শঙ্খ নদী হিসেবে নথিভুক্ত করে। যদিও শঙ্খ নামটি কীভাবে প্রচলিত হলো, তার নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। ১৮৬০ সালের দিকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম গেজেটিয়ার প্রকাশকালে ব্রিটিশ শাসকরা ইংরেজিতে একে সাঙ্গু নদী হিসেবে চিহ্নিত করে। কেননা ব্রিটিশরা শঙ্খ উচ্চারণ করতে পারতো না। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী সাংগু রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে উৎপন্ন হয়ে থানচি উপজেলার সবকটি ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এ নদীটি এই জনপদের প্রাণ। উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড মূলত এই নদীকে ঘিরেই।

পাহাড়ি এলাকার প্রকৃতি অনুযায়ী অসংখ্য ছোট-বড় ঝরনা থেকে সৃষ্টি হওয়া ছোট ছোট নদী বা ছড়া এসে মিশেছে শঙ্খ নদীতে। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী এটি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম নদী। যার দৈর্ঘ্য ২৯৪ কিলোমিটার। দেশের দীর্ঘতম নদী পদ্মা, যার দৈর্ঘ্য ৩৪১ কিলোমিটার। দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী ইছামতি, দৈর্ঘ্য ৩৩৪ কিলোমিটার। তবে পদ্মা ও ইছামতির সঙ্গে শঙ্খ নদীর ধরন ও বৈশিষ্ট্য একেবারেই আলাদা। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে তিনটি নদীকে অভিন্ন নদী বলা হয়, শঙ্খ তার একটি। বইপত্রেও সেরকমই উল্লেখ আছে। কিন্তু এখন গবেষকরা বলছেন, শঙ্খ নদীর উৎপত্তি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের যে পাহাড়ে, সেটি বাংলাদেশের ভেতরেই। ফলে এটি একেবারেই বাংলাদেশের নিজস্ব নদী। তবে কিছু ঝিরি বা ছোট ছোট পানির প্রবাহ হয়তো মিয়ানমার অংশে থাকা পাহাড় থেকে এই নদীর উৎসমুখে এসে পড়েছে। কিন্তু তারপরও নদী গবেষকরা শঙ্খ নদীর উৎসমুখ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বলেই মনে করেন।

প্রস্থে কম হলেও দীর্ঘ এই নদীটি প্রবাহিত হয়েছে বান্দরবান ও চট্টগ্রাম জেলার সাতটি উপজেলার ওপর দিয়ে। এগুলো হচ্ছে বান্দরবানের থানচি, রুমা, রোয়াংছড়ি এবং বান্দরবান সদর, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও বাঁশখালী। মূলত এটি থানচি উপজেলার শেষ প্রান্ত, অর্থাৎ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পাহাড়ে উৎপত্তি হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাঁশখালি উপজেলার ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।

শহীদুল জহিরের বিখ্যাত গল্প ‘ডলু নদীর হাওয়া’র ডলু হচ্ছে শঙ্খ নদীর উপনদী। আর এর শাখা জলকদর ও শিকলবাহা নদী। শঙ্খ নদীর অববাহিকার আয়তন দুই হাজার ৭৬৪ বর্গ কিলোমিটার। তার মানে একটি বিশাল জনপদ এই নদীর স্রোতধারায় সিক্ত। পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা এই পাথুরে নদীর স্বচ্ছ জলধারা এই জনপদের মানুষ, বৃক্ষ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি বিরাট আশির্বাদ।

রেমাক্রি জলপ্রপাতের কাছে শিলগিরি রিসোর্ট

বিকালের আলো থাকতে থাকতেই আমরা পৌঁছে যাই রেমাক্রি। পর্যটকদের একটি বড় আকর্ষণ। দুর্গাপূজার লম্বা ছুটির কারণে রেমাক্রির মতো এমন দুর্গম জায়গায়ও যে পর্যটকদের এত ভিড় হবে, সেটি আমাদের কল্পনায়ও ছিল না। প্রথমত আগের পুরো রাত ঢাকা থেকে বান্দরবান সড়কপথের ঝক্কি, তারপর বান্দরবান থেকে টানা চার ঘণ্টা চান্দের গাড়িতে পাহাড়ের সরু, খাড়া ও নিচু পথে ‍বিপজ্জনক যাত্রা এবং তারপর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আরও প্রায় তিন ঘণ্টা পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে রেমাক্রি পৌঁছানোর পরে যখন দেখা গেলো যে, এখানে রাত্রিযাপনের মতো কোনো ব্যবস্থা নেই—সেটি রীতিমতো মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা। নানা চেষ্টা তদবিরের পরে আমাদের থাকার একটা ব্যবস্থা হয় এবং রুমের ভেতরে প্রবেশের পরে ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিলে হয়তো ভোর হয়ে যেতো। কিন্তু রেমাক্রির জলপ্রপাতের তীব্র মুর্ছনা যেভাবে আমাদের ডাকছিল, তাতে রুমের ভেতরে বসে থাকার কোনো সুযোগ ছিল না। পোশাক বদলে আমরা সদলবদলে নেমে পড়ি রেমাক্রি অবগাহনে। যতগুলো খাল ও ঝিরি শঙ্খ নদীকে জীবন্ত রাখে, রেমাক্রি খাল তার অন্যতম এবং রেমাক্রি খাল ও শঙ্খ যেখানে মিলিত হয়েছে, সেখানেই আমাদের পরবর্তী দুদিনের ডেরা।

শঙ্খ নদীর পানির উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখা খালগুলোর মধ্যে এই রেমাক্রি ছাড়াও আছে পর্দা খাল, রুমা খাল, চিতাই, বালি, বড়পালিছড়া, পুমাজিছড়া, মুরুঞ্জাছড়া, তারাসাছড়া, নেয়াপাতং, বিচিং, চেমী, ধোপা, লালুটিয়া, ইত্যাদি। একসময় এই নদীতে চেলা, চেবলি, চাটকিনি, গুরামুইক্কা, মহাশোল, পাবদা, চিংড়ি, বাইম, জাত পুটি, ফান্ডা, ডারকিনা, চিতলসহ নানা জাতের মাছ মিলতো। কিন্তু রেমাক্রির জলপ্রপাতে ঘোরাঘুরির সময় আমরা যে দুয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দাকে জাল নিয়ে মাছ ধরতে দেখেছি, তাদের কারো জালেই কোনো মাছ উঠতে দেখিনি। তারাও বললেন, এখন কালেভদ্রে মাছ পাওয়া যায়। যে কারণে আমরা যে কটেজে এখানে দুদিন ছিলাম, দুদিনই খেতে হয়েছে মাংস ও ডিম।

আমাদের এই ভ্রমণের আসল উদ্দেশ্য অবশ্য রেমাক্রি নয়, বরং নাফাখুম। অনেক পর্যটকের কাছে যেখানে পৌঁছানো অনেকটা স্বপ্নের মতো। ২১ অক্টোবর ভোরে শুরু হয় আমাদের জার্নি টু নাফাখুম। এটি থানচি উপজেলায় অবস্থিত একটি জলপ্রপাত। স্থানীয়রা বলেন, নাফা একধরনের মাছ। আর খুম মানে জলপ্রপাত। নাফা নামে এই মাছ স্রোতের ঠিক বিপরীত দিকে চলে। বিপরীত দিকে চলতে চলতে মাছগুলো যখন লাফিয়ে ঝরনা পার হতে যায় ঠিক তখনই পাহাড়ের অধিবাসীরা লাফিয়ে ওঠা মাছগুলোকে জাল বা কাপড় দিয়ে ধরে ফেলে। বলা হয়, এ থেকে এই জলপ্রপাতের নাম নাফাখুম। অনিন্দ্য সুন্দর এই জলপ্রপাতে রেমাক্রি থেকে হেঁটে গেলে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা। তবে আমাদের সৌভাগ্য, রেমাক্রি খালে পানি ছিল। ফলে আমরা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নাফাখুম যেতে সক্ষম হয়েছি। অবশ্য পুরোটা পথ নয়। বরং বেশ খানিকক্ষণ দ্রুতগামী এই নৌকা চলার পরে একটি জায়গায় আমাদের নামতে হয়। সেখান থেকে  পায়ে হেঁটে অনেকটা দূর যাওয়া পরে আবার একটা নৌকায় খাল পার হয়ে কিছুটা হেঁটে আরেকটা নৌকায় নাফাখুম। জুলাই-আগস্ট মাসে রেমাক্রি খালে পানি যখন আরও বেশি থাকে, তখন রেমাক্রি থেকে নাফাখুম পর্যন্তই নৌকায় যাওয়া সম্ভব। তবে অক্টোবরের শেষ থেকে পানি কমতে থাকে। শীতের পুরো মৌসুমে এখানে যেতে হয়পায়ে হেঁটে। তবে পাহাড়ের পাদদেশ আর রেমাক্রি খালের অপার সৌন্দর্য, বিশেষ করে খালের মাঝখানে এবং দুই পাড়ে বিশাল আকারের পাথর দেখতে দেখতে এই পথে হাঁটায় কোনো ক্লান্তি আসে না। ফলে আপনি এখানে নৌকায় যান কিংবা পায়ে হেঁটে, দুই অভিজ্ঞতাই আপনাকে মুগ্ধ করবে। বহু বছর এই ভ্রমণের স্মৃতি আপনাকে রোমাঞ্চিত করবে। দিনের বড় অংশ নাফাখুমে কাটিয়ে আমরা বিকালের দিকে সেখান থেকে রওনা হই রেমাক্রির দিকে। ফিরতি পথে আমার প্রায় অর্ধেকটা হেঁটে আসি। খালের পাড় ধরে। পাহাড়, জঙ্গল ও ঝিরিপথের অপার বিস্ময়ের সাথে তাল মিলিয়ে। এ এক স্বর্গীয় যাত্রা। এটা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

নাফাখুম জলপ্রপাত

সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে আমরা আবারও রেমাক্রি জলপ্রপাতে। এইবার সেখানে বড় বড় পাথরের গা ঘেঁসে পানির পতনের ধ্বনি আরও উচ্চকণ্ঠ। আরও মধুর। আরও বেশি মায়াবী। প্রচুর মানুষ সেখানে গোসল করছেন। আশ্চর্যে বিষয় হলো, এই দুর্গম জায়গায় বেশ কয়েকটি পরিবারকে দেখা গেলো ছোট শিশু সন্তানকেও নিয়ে এসেছেন। যদিও পিচ্ছিল পাথর আর তীব্র স্রোতের ভেতরে শিশুদের নিয়ে আসাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের চোখের সামনেই একজন নারী তার ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে রেমাক্রির স্রোতে প্রায় ভেসে যাচ্ছিলেন। লোকজনের সহায়তায় অল্পের জন্য রক্ষা পান।

রেমাক্রি জলপ্রপাতের পাশেই পাহাড়ের উপরে আমাদের থাকার ঠিকানা শিলগিরি রিসোর্ট। রাতে এখানে পানির শব্দ শোনা ছাড়া বেশি কিছু করার নেই। জেনারেটরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পাওয়া যায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা। সুতরাং আলো নিভে গেলে রাত ১০টায় ঘুম। সারাদিনের অনেক হাঁটাহাটি আর নাফাখুম জলপ্রপাতের অবগাহনের কারণে ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিতেই চোখের পলকে ভোর ৬টা বেজে যায়।

এবার আমাদের আসল শঙ্খযাত্রা। কেননা থানচি থেকে এখানে আসার দিন বৃষ্টি আর মেঘলা আবহাওয়ায় মেজাজ খিটখিটে থাকায় শঙ্খের আসল রূপ আমাদের চোখে ধরা পড়েনি। কিন্তু আর ভোরটা বেশ উজ্জ্বল। নাশতা সেরে সকাল পৌনে আটটার দিকে আমাদের নৌকা স্টার্ট নেয়। রেমাক্রির মায়াবী জলপ্রপাত আর শিলগিরি রিসোর্ট পেছনে ফেলে আমরা দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে দ্রুত গতিতে চলছে আমাদের সরু নৌকা। শঙ্খের বৈশিষ্ট্য হলো, যেহেতু উৎপত্তিস্থল থেকে তীব্র বেগে পানি নিচের দিকে নামে, ফলে রেমাক্রি থেকে থানচি যাওয়ার এই যাত্রাটা বেশ কঠিন। প্রথমত ইঞ্জিনাচালিত হওয়ায় সরু নৌকাগুলো বেশ দ্রুতগামী, অন্যদিকে নদীর তীব্র স্রোতের ধাক্কা। এই গতির ভেতরে বড় বড় পাথর এড়িয়ে গাড়ির রেসের মতো কৌশলে সামনে যেতে হয়। উল্টো দিক থেকে আসা নৌকার সাথে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও প্রবল। ফলে শঙ্খ নদীর এই তীব্র স্রোতে পাথরের ফাঁক দিয়ে নৌকা চালিয়ে নেয়াটা বিশাল দক্ষতার বিষয়। অনেক সময় মনে হয় এটা বুঝি উড়োজাহাজ চালানোর চেয়েও কঠিন।

পাহাড়ের পাদদেশে এই পাথরের পথ ধরেই হেঁটে যেতে হয়

থানচি থেকে রেমাক্রি যাওয়া যতটা কঠিন, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং ফেরার পথ। অনেকটা সময় চলার পরে আমাদের একটা জায়গায় নামতে হয়। কেননা পানি কম এবং বড় পাথরের কারণে নৌকা ঠেলে নিতে হয়। সেটুকু পথ আমরা পাহাড়ের পাদদেশ ধরে, পাথরের গা বেয়ে বেয়ে চলে যাই। আবার নৌকায় উঠি। কিছুদূর যাওয়ার পরে আমাদের ছেড়ে দেয়া হয় বাঘের মুখে। বাঘের মুখ এখানের একটি বিখ্যাত জায়গা। ছোট দোকানপাটও আছে।  আমরা চা বিস্কিট কলা খেয়ে আবার হাঁটতে থাকি। কেননা এখানেও একই সমস্যা। অনেকটা পথ যাওয়ার পরে আবার নৌকায় উঠে এক দুর্দান্ত নৌ রেসের সঙ্গী হই। নদীর দুই ধারে বিশাল পাহাড়, ঘন সবুজ অরণ্য, কোথাও কোথাও মনে হয় পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা লেগে এই বুঝি বিরাট মেঘের খণ্ড নিচে পড়ে যাবে; কিছু দূর পরপর পাহাড়িদের বাড়িঘরের যে মায়াবি দৃশ্য, সেখান থেকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ ফেরানো অসম্ভব। পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য বোধ হয় এই শঙ্খ নদী এবং তার দুই ধারে।…

সর্পিল নদীর তীব্র স্রোত এবং পাশ দিয়ে আরেকটি দ্রুত গতির নৌকা চলে গেলে পানির ঝাপটা এসে আপনাকে ভিজিয়ে দেবে। রৌদোজ্জ্বল আবহাওয়ায় এরকম ভিজতে ভিজতে আমরা চলে আসি থানচি। শঙ্খ এখানেই শেষ নয়। সে চলে গেছে আরও বহুদূর। এভাবেই সর্পিল আর পাথুরে পথ ধরে শঙ্খ মিশে গেছে বঙ্গোপসাগরে। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদী উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশলেও  শঙ্খ সৃষ্টি হয়েছে বান্দরবানের দক্ষিণাঞ্চলে। তারপর সে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে শেষ হয়েছে।

আমরা থানচি থেকে রেমাক্রিতে গিয়ে শঙ্খের যাত্রা শেষ করলেও রেমাক্রির উজানে এই নদী আরও ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার এগিয়েছে। ওই পথে বড়মদক, ছোট মধুবাজার, বড় মধুবাজার, আন্ধারমানিক বাজার, নারিচ্যবাজার, লিক্রিবাজার হয়ে পানঝিরি বাজার পর্যন্ত এলাকা আছে। তবে এই অংশে সাধারণত পর্যটকদের যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। তাছাড়া রেমাক্রির পর নদীটি আরও সরু, দুর্গম ও পাহাড়ি হয়ে যায়। তাই রেমাক্রিতে যে ধরনের ইঞ্জিনচালিত পর্যটক নৌকা চলে, সেই নৌকা দিয়ে পুরো ৩০–৪০ কিলোমিটার উজানে গিয়ে উৎসে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাছাড়া শঙ্খের উৎসমুখে যাওয়াটা নিরাপদও নয়।

শঙ্খের দুই পাড়ে বসবাসকারী প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই মারমা নৃগোষ্ঠীর। তাদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে এই নদী মিশে আছে ওতপ্রোতভাবে। তাদের বেঁচে থাকা, বিশেষ করে পানির উৎস এই নদী। তবে নদীর প্রায় ২০টি স্থানে হাট-বাজারের বর্জ্যের কারণে নদী দুষিত হচ্ছে। টোব্যাকো কোম্পানিগুলো শঙ্খ নদীর অববাহিকায় জুমচাষিদের তামাক চাষে উৎসাহিত করায় জুমের বদলে বেড়েছে তামাক চাষ। তামাক পাতা নদীতে ধোয়ার ফলে পানি দূষিত হচ্ছে। আবার তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বিষ মিশছে শঙ্খ নদীতে। সেইসাথে পানিতে বিষ মিশিয়ে এবং নানা বদকৌশলে মাছ শিকারের ফলে শঙ্খ নদীতে মাছের উৎপাদন কমে গেছে। অর্থাৎ দেশের আর দশটি নদীর যে সংকট, তা থেকে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম এবং অন্যতম সুন্দর এই নদীটিও মুক্ত নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top